এই তো হেমন্ত দিন, দিল নব ফসল সম্ভার/অঙ্গনে অঙ্গনে ভরি/ এই রূপ আমার বাংলার। হেমন্ত তার অনুভবের ছোঁয়া দিয়ে আলতো পায়ে শীতের জানান দিয়ে যায়। অখ- নীলাকাশে প্রকৃতির ¯িœগ্ধ শান্ত অলসতায় আড়মোড়া ভেঙ্গে ওঠার লাবণ্য থেকে নজর ফেরানো দায়। হেমন্তের অপরূপতার কথা কবিতাসহ সাহিত্যের নানা অঙ্গনে ওঠে আসে স্বমহিমায়। তেমনি অগ্রহায়ণে নতুন ফসল তোলার উৎসবে জীবনের গান অবিচ্ছেদ্য। হেমন্ত বাঙালির আবহমান চিরায়ত ঐতিহ্যের কথা মনে করে দেয় নবান্নের লোক উৎসবের মধ্য দিয়ে।
ঘাসের ডগায় মুক্তা দানার মতো শিশিরের খেলায় সোনাপাকা ধান খেতে বাতাসের দোলায় সোনালি রোদ্দুরের উঁকি ও কুয়াশার চাদর না কাটতেই হেমন্তের উৎসবে মেতেছিল মঙ্গলবার বগুড়ার শিবগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম। কারণ নতুন ধান কাটার উৎসবের আবির ছড়িয়ে এসেছে যে নবান্নের ডাক। এমন আহ্বানে উৎসবের আলো ছড়িয়ে বর্ণিলতা আর সৌহার্দ্য সম্প্রীতির বন্ধনে হয়ে গেল দিনব্যাপী ‘নবানের’ (স্থানীয় ভাষায়) মাছকেন্দ্রিক উৎসবের আয়োজন- মাছের মেলা। এই মাছের মেলা ঘিরে সেখানকার অর্ধশত গ্রামে নামে উৎসবের ঢল।
বাড়ি বাড়ি নাইয়রে আসা নারীদের আনন্দমুখরতা। শুধু মাছ নয়, নবান্ন উপলক্ষে এই আয়োজনে ছিল গ্রামীণ মেলার সকল অনুষঙ্গ। দই, মিষ্টি, খগরাই, বাতাসা, জিলাপি থেকে শুরু করে নানা ধরনের মিষ্টান্ন। ছিল নাগরদোলা, চুড়ি, ফিতার দোকান থেকে বাঁশির পসরা, কোনো কিছুই বাদ ছিল না। হেমন্ত মানেই তো নতুন ধান কাটার উৎসব। নতুন ধানের চালে অন্ন মুখে দেওয়ার নানা আচার পার্বণের মধ্যে নবান্নের উৎসব থেকে তো বাঙালিকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না।
বাঙালির শিকড়ের ঐতিহ্যে গ্রামবাংলায় লোকজ মেলা আর নবান্নের উৎসব অবিচ্ছেদ্য। যদিও আধুনিক জীবনযাত্রায় এর অনেক কিছুই ফিকে হয়ে যাচ্ছে, তবুও আবহমানকাল থেকে বাঙালির অন্যতম লোকজ আয়োজনের নাম নবান্ন উৎসব। নবান্ন ঘিরে মেলার আয়োজন যেমন অনেক প্রাচীন, তেমনি তা ঐতিহ্যের শিকড়ে এক আবেগময় বন্ধনেও জড়ানো। নবান্ন ও মেলাকে›ন্দ্রিক উৎসব এখনো গ্রামীণ জীবনে সর্বজনীন উৎসবের আরেক রূপ। নবান্ন উৎসব মিশে আছে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে।
বাঙালি সং¯ৃ‹তির নানা বর্ণময় রূপের বহমানতা তুলে ধরে ভিন্নমাত্রার দ্যোতনা, আনে নবান্ন উৎসব উপলক্ষে লোকজ মেলার আয়োজন। শিবগঞ্জের গ্রামে তেমনি একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব নবান্নের মাছের মেলা। ধর্ম-বর্ণ মিলেমিশে ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ সরিয়ে উৎসবের আবীরে একাকার। সম্প্রীতির মেলবন্ধন হয়ে উঠে এই মাছের মেলা, যা চলছে যুগের পর যুগ, শত বছর পেরিয়ে।
‘এই হেমন্তে কাটা হবে ধান, আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান’ নতুন ফসলের সুবর্ণ যুগ আসে। সভ্যতার শুরু থেকেই খাদ্য সংগ্রহকেন্দ্রিক উৎসব ছিল। খাদ্য সংগ্রহ ও উৎপাদনকেন্দ্রিক নানা আচার অনুষ্ঠান ও উৎসবের উদ্ভব। নতুন ধান কেটে ঘরে তোলা উপলক্ষে ফসল ঘিরে নবান্ন উৎসবে পরিণত হয়েছিল কালের যাত্রায়। হৈমন্তিক উৎসবের আরেক নাম নবান্ন।
গ্রামবাংলার জীবনপটে আমন ফসল কাটা উপলক্ষে নবান্ন কেবল একটি ঋতুকেন্দ্রিক উৎসবই নয়, এটি হেমন্তের প্রাণও বলা হয়। সনাতনী পার্বণের সঙ্গে নবান্ন কিন্তু গ্রামীণ জীবনে রন্ধনের উৎসবেও রূপ নেয়। ফসলকেন্দ্রিক উৎসব নবান্ন রন্ধনে নানা ব্যঞ্জনা যুক্ত করে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে নবান্ন নানা আচার পালনের বিষয় থাকলেও নবান্নের মেলা কিন্তু ধর্মের সীমারেখা পেরিয়ে সম্প্রীতির ডানা ছড়িয়ে সামাজিক মেলবন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে। তাই অসাম্প্রদায়িক এক উৎসবের নাম নবান্ন।
বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারায় এরই যথার্থতা তুলে ধরে আসছে শিবগঞ্জের নবান্নকেন্দ্রিক মাছের মেলা। তবে মাছের কেনাবেচাই মেলার আয়োজন সীমাবদ্ধ নয়, রয়েছে নবান্ন মেলার সব অনুষঙ্গের সার্থকতা। শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে শিবগঞ্জের উথলী বাজারে বসে নবান্নের মাছের মেলা। মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে বটগাছ, বৃহদাকায় তেঁতুল গাছসহ অন্যান্য গাছের ছায়ার নিচে এই আয়োজন ভিন্ন মাত্রার আবহ এনে দেয়। সবুজের ছায়ার মাটির গন্ধ অন্যরকম অনুভব তৈরি করে রাখে। অনেক মানুষের শোরগোল যেন হৃদয়ের ডাকে উচ্ছ্বাসের বর্ণলীতে ভরে তোলে।
ভোরের সুর্য রাতের আঁধার মিলিয়ে দেওয়ার আগেই উথলীসহ আশপাাশের এলাকাগুলো থেকে শুরু হয় মেলায় যাওয়ার পালা। আগের রাত থেকেই মেলার পণ্য ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ আসতে থাকে ট্রাকের পর ট্রাক বোঝাই করে। ভোর থেকে মেলা প্রাঙ্গণে শুরু হয় বেচা-কেনা। নবান্ন উৎসবের এই মেলায় যে ক্রেতাই আসুক আর তার অন্য কেনাকাটার সঙ্গে মাছ কেনা চাই। কারণ মাছ না নিলে মেলায় আসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মূলত নবান্ন উপলক্ষে মাছের মেলা হলেও দই, মুড়ি, চিড়াসহ নানা ধরনের মিষ্টান্ন ও নতুন উঠা সব ধরনের সবজিতে ভরে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। কেউ বলেন এই মেলা শত বছরের। কেউবা বলেন আরও বেশি।
তবে মেলার আয়োজনকাল নিয়ে নানা কথা থাকলেও এটি ধর্মবর্ণ ছাড়িয়ে সব শ্রেণির মানুষের প্রাণের আয়োজন হয়ে উঠেছে। সময়ের পথপরিক্রমায় এটি প্রাচীন হয়ে উঠলেও প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে উৎসবের আলোর কেন্দ্র হয়ে এর জলুস বেড়েই চলেছে। আশপাশের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের নানা ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ এই উচ্ছ্বাসের অংশ হন। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সীদের মিলনমেলায় পরিণত হয় এটি। উথলী গ্রাম ঘিরে আশপাশের গ্রাম সরকারপাড়া, নারায়ণপুর, ধন্দাকোলা, গণেশপুর, দেবীপুর লক্ষ্মীকোলা, গুজিয়া, আকনপাড়া, অর্জুনপুর, গরীবপুর, সাদুলাপুর, বেড়াবেলাসহ অর্ধশতাধিক গ্রাম ছাড়াও আশপাশের উপজেলাগুলো থেকেও লোকজন এই মেলায় আসেন।

