প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই যারা শহর পরিচ্ছন্ন করার কাজে নেমে পড়েন, সমাজের মূলধারা থেকে তারা বরাবরই উপেক্ষিত। রেস্তোরাঁয় বসার অধিকার নেই, চায়ের দোকানে মেলে আলাদা কাপ। এমন বৈষম্য আর বঞ্চনার মাঝেই গাইবান্ধার হরিজন পল্লীর বাসিন্দাদের জীবনে এবার ভিন্নমাত্রার ঈদের আনন্দ ধরা দিয়েছে। বুধবার বিকেলে শহরের স্বাধীনতা প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসন এবং এক বেনামি ব্যবসায়ীর উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাঝে ঈদ উপহার ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়, যা তাদের মুখে অভাবনীয় হাসি ফুটিয়েছে।
পঞ্চাশোর্ধ্ব রুমা বাসফোর দীর্ঘকাল ধরে এই শহরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। বছরের পর বছর সামাজিক বৈষম্যের শিকার এই নারীর কাছে এবারের ঈদ যেন এক নতুন মানবিক বার্তা নিয়ে এসেছে। আবেগাপ্লুত রুমা জানান, যে সমাজে তাদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হয় না, সেখানে জেলা প্রশাসক নিজে তাদের পাশে বসে হাতে উপহার তুলে দিয়েছেন।
এই সম্মান ও প্রাপ্তি তাদের জন্য পরম আনন্দের। তার মতো মৌ, শালু ও বিলু বাসফোরসহ শতাধিক পরিবারের সদস্য এই মানবিক উপহার পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েন।
সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমে হরিজন সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম ও বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি দেখে গভীরভাবে আলোড়িত হন স্থানীয় এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ী। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে হরিজন পল্লীর প্রতিটি পরিবারকে নগদ এক হাজার টাকা করে সহায়তা দেবেন। এই মহতী উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয় গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ আট ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর বিশেষ প্যাকেট প্রস্তুত করেন।
বুধবারের এই আবেগময় আয়োজনে জেলা প্রশাসক নিজ হাতে এই উপহার সামগ্রী ও বেনামি ব্যবসায়ীর দেওয়া নগদ অর্থ বিতরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যারা প্রতিদিন আমাদের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখেন, তারা সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের বাদ দিয়ে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আখতার এই উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী ও প্রশংসনীয় হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীকে দূরে সরিয়ে রেখে কখনোই একটি রাষ্ট্র বা সমাজ সামনে এগোতে পারে না।
আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক যাদব সরকার, এনডিসি সাব্বির রহমান, গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সভাপতি অমিতাভ দাশ হিমুনসহ স্থানীয় সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনেরা। যুগের পর যুগ ধরে হরিজন সম্প্রদায় যে সামাজিক অবহেলার মধ্যে বসবাস করছে, সেখানে এ ধরনের উদ্যোগ একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের আশা জাগায়। এই ক্ষুদ্র সহায়তায় অবহেলিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের চোখে যে আশার আলো দেখা গেছে, তা সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

