চরম দারিদ্র্য ও অমানবিক নির্যাতনের অন্ধকার অতীত পেছনে ফেলে এক নতুন ও আলোকিত জীবনের পথে পা বাড়িয়েছেন দিনাজপুরের মেয়ে পূর্ণিমা আক্তার সুমি। শিশু বয়সে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে চরম নিষ্ঠুরতার শিকার হওয়া এই কিশোরী এক পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের পরম আশ্রয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর বেড়ে ওঠার পর সম্প্রতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। সমাজে মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনা।
জানা যায়, দিনাজপুরের এক দরিদ্র কৃষিশ্রমিক মকবুল হোসেন ও সাহারা বানু দম্পতির সন্তান সুমি। চরম অভাবের তাড়নায় ছোটবেলাতেই তাকে বগুড়ার একটি পরিবারে গৃহকর্মীর কাজে পাঠিয়েছিলেন তার মা-বাবা। কিন্তু সেখানে নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে শিশুটির ভাগ্যে জুটেছিল নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
মেয়ের এই ভয়াবহ দুরবস্থার খবর পেয়ে দিশেহারা মা-বাবা তৎকালীন নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দ্বারস্থ হন। বিষয়টি জানার পর তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নিয়ে নির্যাতিত শিশুটিকে উদ্ধার করেন। এরপর উন্নত জীবনের আশায় তাকে ঢাকায় বসবাসরত তাঁর বড় ভাই, ট্রাফিক পরিদর্শক আনোয়ার কবির সুজনের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেন।
ঢাকার সেই বাড়িটিই হয়ে ওঠে সুমির জীবনের এক নতুন ঠিকানা। আনোয়ার কবির সুজন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে নিজেদের ঔরসজাত সন্তানের মতোই আপন করে নেন। গত ১৩টি বছর ধরে তাঁরা পরম মমতা ও স্নেহে সুমিকে লালন-পালন করেছেন। তাঁরা তাকে শুধু একটি নিরাপদ আশ্রয়ই দেননি, বরং শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁদের সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ছোঁয়ায় সুমির জীবনের পুরনো সব ক্ষত ধীরে ধীরে মুছে যায়।
অবশেষে সেই বিভীষিকাময় অতীত পেরিয়ে সুমির জীবনে সূচিত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। সম্প্রতি গাইবান্ধার একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয় অত্যন্ত আনন্দমুখর ও জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে রংপুরের যুবক তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে সুমির বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে সমাজের নানা স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমাগম ঘটে। শিক্ষক, চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নবদম্পতিকে প্রাণঢালা আশীর্বাদ জানান। অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা অভিমত প্রকাশ করেন যে, জন্মদাতা মা-বাবার চরম অসহায়ত্বের কারণে যে শিশুটির জীবন একসময় অন্ধকারে তলিয়ে যেতে বসেছিল, অন্য একটি পরিবারের পরম মমতায় তার এমন সম্মানজনক পরিণতি বর্তমান সমাজের জন্য এক বিরাট ও অনুকরণীয় বার্তা।
নতুন জীবনের সূচনায় পূর্ণিমা আক্তার সুমি ও তৌহিদুল ইসলাম দম্পতি সকলের কাছে শুভকামনা ও দোয়া প্রার্থনা করেছেন। অন্যদিকে, আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সুমির পালক মা-বাবা জানান, বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। সুমি চিরকাল তাঁদেরই মেয়ে হয়ে থাকবে এবং আজীবন তাঁরা এই নবদম্পতির পাশে ছায়ার মতো থাকবেন। সমাজের সচেতন মহল মনে করছেন, এমন হৃদয়বান মানুষেরা যদি আরও বেশি মাত্রায় এগিয়ে আসেন, তবে দেশের কোনো অসহায় শিশুই আর অবহেলার শিকার হবে না। গভীর ভালোবাসা, মানবিকতা ও সুশিক্ষার স্পর্শে বদলে যাবে বহু বিপন্ন শিশুর ভবিষ্যৎ।
– DBC News Video

