ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালীন গণহত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় পলাতক সাবেক এই সরকারপ্রধানকে হস্তান্তর করা ভারতের জন্য একটি ‘অপরিহার্য দায়িত্ব’।
রবিবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, নয়াদিল্লির কাছে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুই দিন আগে পাঠানো এই চিঠিতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার এক তীব্র গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পনেরো বছরের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ প্রাণ হারান, যার দায়ভার তৎকালীন সরকারের ওপর বর্তায়। বর্তমানে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন, যেটি তার শাসনামলে বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল।
সম্প্রতি ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা।
আদালতের এই রায়ের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ২০১৩ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফেরত পাঠানো ভারতের জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা। মন্ত্রণালয় আরও কঠোর ভাষায় মন্তব্য করে যে, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কাউকে আশ্রয় দেওয়া ‘ন্যায়বিচারের পরিপন্থী’ এবং শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়া একটি ‘চরম অবন্ধুসুলভ আচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে।
অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার রায়ের বিষয়টি ‘নজরে এসেছে’ বলে মন্তব্য করলেও, তাকে হস্তান্তরের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ঢাকার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার এ নিয়ে অন্তত তৃতীয়বারের মতো প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানাল। শেখ হাসিনার পতনের পর দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে যোগ দিতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ভারত সফর করেন এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, খলিলুর রহমান ভারতীয় উপদেষ্টাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।
আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে আন্দোলনের পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে বর্তমানে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা হয়েছে এবং তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এমতাবস্থায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবাসন ইস্যুটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

