বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র বিগত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিবর্তিত হলেও, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন জনপদ গাইবান্ধা জেলা এখনো অগ্রগতির মূল স্রোতধারা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিল্পায়নের দিক থেকে দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় গাইবান্ধা এখনো অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে উন্নয়নের নানা সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও এই জেলার বিশাল একটি জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
গাইবান্ধার এই পশ্চাৎপদতার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এর ভৌগোলিক অবস্থান ও নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগকে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হয় এই জেলার হাজার হাজার মানুষ। নদীভাঙনে আবাদি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলোর পক্ষে অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্যোগের কারণে এখানকার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি বারবার বিপর্যস্ত হয়, যা জেলার সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের চরম অভাব জেলার এই দীর্ঘস্থায়ী পিছিয়ে পড়ার আরেকটি অন্যতম প্রধান কারণ। পর্যাপ্ত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং উন্নত অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় এই অঞ্চলে বড় কোনো শিল্পকারখানা বা উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বিনিয়োগকারীরাও নানাবিধ ঝুঁকির কারণে এখানে মূলধন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখান না। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না বললেই চলে।
জীবিকার তাগিদে এখানকার তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষদের একটি বিশাল অংশ রাজধানী ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে শ্রমজীবী হিসেবে পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য খাতেও জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং চরাঞ্চলগুলোর অবস্থা বেশ শোচনীয়। পর্যাপ্ত মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রের অভাবে চরাঞ্চলের লাখো মানুষ দীর্ঘকাল ধরে তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন।
অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, গাইবান্ধা জেলাকে এই দীর্ঘ পশ্চাৎপদতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে হলে অবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি, সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। বিশেষ করে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ, সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্থানীয়ভাবে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপনে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
এই অবহেলিত অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার দৃশ্যমান মানোন্নয়নে একটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার দ্রুত প্রসার ঘটানো গেলে তা গাইবান্ধাকে দেশের অন্যান্য উন্নত জেলার সমকক্ষ হতে কার্যকরভাবে সাহায্য করবে। সামগ্রিক ও সুষম জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার স্বার্থে গাইবান্ধার মতো আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের বিশেষ মনোযোগ ও অগ্রাধিকারমূলক অর্থ বরাদ্দ প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি।

