ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতিপ্রাপ্ত রংপুরের সুস্বাদু ‘হাঁড়িভাঙা’ আমের আনুষ্ঠানিক বাজারজাত আজ সোমবার (১৫ জুন) থেকে শুরু হয়েছে। সাধারণত প্রতি বছর ২০ জুন আম বিক্রি শুরু হলেও এবার তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গত ১০ জুন থেকেই কিছু চাষি আগাম আম পাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ফলন কম হওয়া এবং হাঁড়িভাঙা আমের প্রধান মোকাম মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জ হাটের বেহাল দশায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা অস্বস্তিতে থাকলেও, এবার অন্তত ৩০০ কোটি টাকার আম বিক্রির প্রত্যাশা করছে কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, সামান্য বৃষ্টিতেই পদাগঞ্জ হাট ও এর প্রবেশমুখ কাদাজলে একাকার হয়ে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় প্রধান সড়কের প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশজুড়ে বাধ্য হয়ে কেনাবেচা চলে। অনলাইন ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান জানান, নজিরেরহাট-পদাগঞ্জ সড়ক চলাচলের অযোগ্য হওয়ায় তাদের ১০ কিলোমিটার পথ ঘুরে আসতে হয়। অনলাইনে ১০০ টনের বেশি আম সরবরাহকারী জেসমিন আখতার, ক্রেতা শাফিউল ইসলাম এবং ঢাকা থেকে আসা পাইকার মোহাম্মদ আবু হাসান হাটের নাজুক পরিবেশ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ব্যবসায়ী আবু হাসানের অভিযোগ, মণপ্রতি ৪টি আম টোল হিসেবে কেটে নেওয়ার পরও হাটের কোনো উন্নয়ন করা হচ্ছে না।
আমিনুল ইসলাম, সাজ্জাদ মণ্ডল, ছামিউল ইসলাম ও সাগর মিয়ার মতো প্রান্তিক চাষিরা জানান, হাঁটু সমান কাদায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। লিজ চাষি ফখরুল ইসলামের আক্ষেপ, শত কোটি টাকার বাণিজ্য হলেও এই হাটে শেড বা বাথরুমের ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা নেই। জানা গেছে, এবার ৫৬ লাখ টাকায় ১৬ জনের অংশীদারিত্বে হাটটি ইজারা নেওয়া হয়েছে। ইজারাদারদের একজন মানিক মিয়া জানান, রাস্তা ও ড্রেন সংস্কারের লিখিত আবেদন করলেও ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউএনও কোনো ব্যবস্থা নেননি। তবে মিঠাপুকুরের ইউএনও মো. পারভেজ দাবি করেন, হাটের উন্নয়নের দায়িত্ব ও বরাদ্দ সম্পূর্ণ চেয়ারম্যানের অধীনে।
এদিকে, গত এপ্রিলের শিলাবৃষ্টিতে ৩০-৩৫ শতাংশ আম ঝরে গেছে এবং বৃষ্টির কারণে অবশিষ্ট আমের রঙও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগান মালিক মাহফুজুর রহমান নয়ন জানান, তিনি প্রকারভেদে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা মণ দরে আম বিক্রি করছেন। কৃষানি মাহমুদা বেগম জানান, গত বছর যে আম ২৪০০-২৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা এবার ১৬০০ টাকায়ও বিক্রি করা কঠিন হচ্ছে। উদ্যোক্তা হানিফুর রহমান সজীবের মতে, বর্তমানে আম ১২০০ থেকে ২৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি হাঁড়িভাঙা আমের ওজন ১৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম হয়ে থাকে এবং গাছ থেকে পাড়ার চার-পাঁচ দিনেই তা পেকে যায়। তাই সংরক্ষণের অভাবে প্রচুর আম নষ্ট হয়। ৮ একর জমিতে আম চাষ করা মোসাব্বির বকসি এবং পাইকার জুয়েল মিয়া অবশ্য কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়ার আশায় রয়েছেন। তবে দ্রুত ফলন বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে পাড়ার ৮-১০ দিন আগেই গাছে ছত্রাকনাশক স্প্রে করায় জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকি বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, জেলায় ৩,৫০০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এবার ২,০০০ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড়ে ১০-১২ টন ফলন পাওয়া যাচ্ছে। আমের আকার বড় হওয়ায় কৃষকরা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী। সুজন-এর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু জানান, ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশে রপ্তানি হওয়া এই দ্রুত পচনশীল আমের জন্য বিশেষ ট্রেন বা পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, সোমবার দুপুর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আম বাজারজাত শুরু হচ্ছে। অবকাঠামো, যাতায়াত, ব্যাংকিং ও রপ্তানির সকল প্রতিবন্ধকতা নিরসনে প্রশাসন কাজ করছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি (সূত্রমতে ১২ এপ্রিলও উল্লেখিত) জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায় রংপুরের এই ঐতিহ্যবাহী হাঁড়িভাঙা আম।

