রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২৪২ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা বর্তমানে দেশজুড়ে গভীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সেখানে একের পর এক সুবিশাল মূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। ২৮ ফুট উঁচু শিব এবং ৫৩ ফুট উঁচু কৃষ্ণমূর্তি স্থাপনের পর সম্প্রতি আকাশচুম্বী রামমূর্তি নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। তবে একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় এত বিশাল আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় প্রশাসন গত ১১ জুন এর নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে।
প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এমন সুবিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের নেপথ্য কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে নানা রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলের আশঙ্কা, নিছক ধর্মীয় আবেগের আড়ালে এটি কোনো বিদেশি গোষ্ঠীর সুদূরপ্রসারী কৌশল বা ‘ট্রোজান হর্স’ হতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের উৎস এবং ভিনদেশি প্রভাবের সম্ভাবনা প্রশাসন বর্তমানে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সরকারের কোনো সুস্পষ্ট অনুমতি ছাড়াই এই বিশালাকার মন্দির ও ১৪৪টি মূর্তি নির্মাণের মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল, যা ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে এসেছে।
এই সম্পূর্ণ প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণীর অস্বাভাবিক উত্থান ও অতীত জীবন পুরো বিষয়টিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। হরিদাস দাবি করেছেন, তিনি রোহিঙ্গা শিবিরে সবজি সরবরাহের ব্যবসা করে পাঁচ কোটি টাকা উপার্জন করেছেন এবং সেই অর্থেই এই নির্মাণকাজ চালাচ্ছেন। কিন্তু এর সপক্ষে কোনো আয়কর নথি বা বৈধ কাগজপত্র তিনি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং অনুসন্ধানে তার অতীত জীবনের বেশ কিছু বিতর্কিত অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। ২০২২ সালে প্রতারণা এবং অবকাশযাপন কেন্দ্রের আড়ালে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জিম্মি করার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
হরিদাসের রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলে বিচরণের চাঞ্চল্যকর তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। একসময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র মেরামতের কাজের সুবাদে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে তার যাতায়াত ছিল। সে সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সাথে তার গভীর সখ্যের অভিযোগ রয়েছে, যা সাধারণ একজন শ্রমিকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অস্বাভাবিক। এছাড়াও, তার তিন ভাইয়ের ভারতে অবস্থান এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন তার ভারতে গিয়ে পুনরায় ফিরে আসার বিষয়টিও সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। ভিনদেশি কূটনীতিকদের মন্দির প্রাঙ্গণে নিয়মিত যাতায়াত এবং রাজশাহীতে নিযুক্ত প্রতিবেশী দেশের সহকারী হাইকমিশনার কর্তৃক মূর্তির উদ্বোধন বিদেশি সম্পৃক্ততার আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করেছে।
বর্তমানে পলাশবাড়ীর ওই মন্দির প্রাঙ্গণটি কঠোর নিরাপত্তার চাদরে আবদ্ধ এবং সর্বত্র নজরদারি ক্যামেরার ব্যবহার করা হচ্ছে। গত ৯ জুন রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় প্রশাসন বর্তমানে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং হরিদাসের অর্থের উৎস খুঁজতে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনে জোরালো তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
